তবুও অনর পেশাগত দায়িত্ব পালনে আমার দেশের পুলিশ - - মানবাধিকার বার্তা

Breaking

Breaking News

Comments

রবিবার, ৩ মে, ২০২০

তবুও অনর পেশাগত দায়িত্ব পালনে আমার দেশের পুলিশ -


নাছির উদ্দিন পল্লব  : মহামারি করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের পাঁচ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল শনিবার মারা যান ঢাকা মহানগর পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে (পিওএম) কর্মরত থাকা উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুলতানুল আরেফিন। এছাড়া এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৭৪১ জন পুলিশ সদস্য। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। পর্যাপ্ত পিপিই (পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট) সরবরাহ না থাকায় র‌্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর অনেক সদস্য আক্রান্ত হচ্ছেন।
তবে করোনা পরিস্থিতিতে জনগণের কল্যাণে সেবার বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখতে পুলিশের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন আইজিপি। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে পুলিশের চলমান কার্যক্রম ও স্বাভাবিক আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রসঙ্গে পুলিশ প্রধান ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বাহিনীর সদস্যদের প্রতি এই নির্দেশ দিয়েছেন।
করোনা ভাইরাসে সম্প্রতি প্রায় প্রতিদিনই কয়েকশ’ ব্যক্তির আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। শুরু থেকেই করোনা প্রতিরোধে মাঠের সম্মুখ যোদ্ধা বাংলাদেশ পুলিশের আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে নানা কর্মকাণ্ডের জন্য পুলিশ সদস্যদের সরাসরি জনসাধারণ এবং আক্রান্তদের সংস্পর্শে যেতে হচ্ছে। ফলে নিজেদের মধ্যেও করোনায় সংক্রমিত হচ্ছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা সংকটের প্রথম থেকেই বিদেশফেরতদের অবস্থান শনাক্ত করে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত, আক্রান্ত ব্যক্তিদের হাসপাতালে পাঠানো, লকডাউন নিশ্চিত করা, ত্রাণ বিতরণ, শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত থেকে শুরু করে করোনায় মৃত ব্যক্তিদের দাফনসহ প্রায় সবক্ষেত্রেই পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে নানা কার্যক্রমের জন্য পুলিশ সদস্যদের সরাসরি জনসাধারণ এবং আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে নিজেদের মধ্যে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
পুলিশ সদরদফতর সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৭৪১ পুলিশ। এরমধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের সদস্য রয়েছেন ৩৫৬ জন। আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন পুলিশের ৫৭ জন। এছাড়া, বর্তমানে ১৭৪ জন সদস্য আইসোলেশনে রয়েছেন এবং কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ১ হাজার ২৫০ জন।
করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রান হারানো পুলিশ সদস্য হলেন- ডিএমপির কনস্টেবল জসিম উদ্দিন (৪০), এএসআই মো. আব্দুল খালেক (৩৬), ট্রাফিক বিভাগের কনস্টেবল মো. আশেক মাহমুদ (৪৩), পুলিশের বিশেষ শাখার এসআই নাজির উদ্দীন (৫৫) এবং সর্বশেষ ডিএমপির মিরপুরের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে (পিওএম) কর্মরত থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) সুলতানুল আরেফিন (৪৪)। এদের মধ্যে গতকাল সকালে রাজারবাগের কেন্দ্রীয় পুলিশ লাইন্স হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুলতানুল আরেফিন মারা যান।
মৃত্যুবরণ করা পাঁচ পুলিশ সদস্য ছাড়াও শুক্রবার রাতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মো. ইমন মিয়া (২১) নামের আরও এক পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। তার কিডনিতে সমস্যা, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট ছিল।
কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের সুপার হাসান উল হায়দার জানান, এসআই সুলতানুল আরেফিন
করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ৩০ এপ্রিল হাসপাতালে ভর্তি হন। তার আগে থেকেই শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল। রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল সূত্র জানায়, এ হাসপাতালের আওতায় এখন পর্যন্ত তিন শতাধিক পুলিশ সদস্যকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে স্থান না হওয়ায় রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ আরও কয়েকটি জায়গায় রোগীদের রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে চিকিৎসক সংকটের কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসক সংযুক্তির অনুরোধ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার পুলিশ হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে ৩০ জন চিকিৎসক সংযুক্তি করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক ডিআইজি ড. হাসান উল হায়দার জানান, আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার জন্য হাসপাতালের বাইরেও আমাদের ব্যবস্থা রয়েছে।
এদিকে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, পুলিশ হাসপাতালের বাইরে যেসব প্রতিষ্ঠানে আক্রান্তদের চিকিৎসা ও আইসোলেশনে রাখা হয়েছে তাদের কোনও একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করতে পারলে ভালো হতো। করোনার সময় কোনও একটি বেসরকারি হাসপাতাল পুরোটাই পুলিশের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কথা বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন কনস্টেবল পর্যায়ের সদস্যরা। এর পরেই রয়েছেন এএসআই ও এসআই পদমর্যাদার সদস্যরা। তারা সরাসরি মাঠে কাজ করেন এবং ব্যারাকে অবস্থান করছেন। এজন্য এদের সবার সুরক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, ডিএমপিতে ৩৪ হাজার পুলিশ সদস্য কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া ঢাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও আক্রান্তের হার বেশি। এ কারণে ডিএমপিতে পুলিশের মধ্যেও আক্রান্তের হার বেশি। তিনি বলেন, আমরা প্রত্যেক সদস্যকে সুরক্ষাসামগ্রী দিয়েছি। তাদের বসবাসের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের সচেতন করা হচ্ছে। তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে, জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিতে সারাদেশে পুলিশের ২ লক্ষাধিক সদস্য বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে থেকে নিরন্তর সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রথমত তাদের মধ্যে ব্যপকভাবে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। নিয়মিত সেসব সচেতনতার বার্তার বিষয়ে সদস্যদের আপডেট করা হচ্ছে। এছাড়া, সিনিয়র কর্মকর্তারা নিয়মিত পুলিশ লাইনসে গিয়ে সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছেন।
পাশপাশি পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মাস্ক এবং হ্যান্ডগ্লাভসসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। আক্রান্তদের সর্বোচ্চ সুচিকিৎসা নিশ্চিতে পুলিশ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী এবং সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন পুলিশলাইনস এবং ব্যারাকে পর্যাপ্ত জীবাণুনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। অফিস এবং পুলিশ লাইনসের প্রবেশমুখ সুরক্ষিত করা হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যারাকে নিরাপদ দূরত্ব বজায়ে বেডগুলো রাখতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে পুলিশ সদস্যদের পরিবারকেও সুরক্ষিত রাখতে নানা পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) মো: সোহেল রানা জানান, করোনা সংক্রমণ থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে পুলিশ ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে। দেশ ও জনগণের প্রতি কমিটমেন্টের জায়গা থেকে পুলিশ সদস্যরা নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন এবং পাঁচজন গর্বিত সদস্য দেশের জন্য আত্মাহুতি দিয়েছেন। আমরা তাদের জন্য গর্বিত। পুলিশের সদস্যরা তাদের এই ত্যাগকে, এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে সাধারণ মানুষের পাশে রয়েছেন এবং মনোবলের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। হাসপাতালে পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recent in Sports

Most Popular

Tags